ভাইরাল ভিডিওটির সূত্রপাত
ইসরায়েল ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে তীব্র সামরিক হামলার পর এক্স (টুইটার), ফেসবুক ও টেলিগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে একটি সমন্বিত অপতথ্য প্রচার অভিযান শুরু হয়। বিভিন্ন ব্যবহারকারী একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করতে থাকেন যে, ইসফাহানের কাছে ইরানি ভূমি থেকে আকাশে উৎক্ষেপণযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর (আইএএফ) একটি এফ-৩৫আই "আদির" পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমানকে ভূপাতিত করার নাটকীয় দৃশ্য এতে ধরা পড়েছে। নিজেদের সামরিক সক্ষমতা জাহির করতে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ প্রতিহত করার বার্তা দিতে ইরানি রাষ্ট্রীয় ও সরকার-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলোতে দ্রুত এই বিবরণটি ফলাও করে প্রচার করা হয়।
তবে, ওপেন সোর্স গোয়েন্দা গবেষক এবং পেশাদার তথ্য-যাচাইকারী সংস্থাগুলো দ্রুত প্রমাণ করে যে এই ফুটেজের সঙ্গে প্রকৃত সামরিক অভিযানের কোনো সংযোগ নেই। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি ইরানের আকাশে ধারণ করা হয়নি এবং এটি কোনো আসল সামরিক সংঘাতের চিত্রও নয়।
ডিজিটাল ফরেনসিক ও সিমুলেশনের প্রমাণ
রিভার্স ইমেজ অনুসন্ধান এবং কি-ফ্রেম বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্বাধীন তদন্তকারীরা মূল ফুটেজের উৎস শনাক্ত করেন, যা সামরিক হামলা সংঘটিত হওয়ার বেশ আগেই ইউটিউবে প্রকাশিত একটি ডিজিটাল কমব্যাট সিমুলেশনের অংশ ছিল। এইচকেবিইউ ফ্যাক্টচেক সার্ভিস-এর ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ক্লিপটি মে ২০২৫-এ একজন সামরিক বিমান চলাচল সিমুলেটর অনুরাগী কর্তৃক আপলোড করা ফ্লাইট সিমুলেশন গেমপ্লের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মূল আপলোডকারী ভিডিওটিকে ভূমি থেকে আকাশে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের একটি কৃত্রিম বিমান যুদ্ধ পরিস্থিতি হিসেবে স্পষ্টভাবেই ট্যাগ করেছিলেন।
ডিজিটাল কমব্যাট সিমুলেটর ওয়ার্ল্ড (ডিসিএস ওয়ার্ল্ড) এবং সংশ্লিষ্ট কৌশলগত সিমুলেশন ইঞ্জিনগুলোর মতো কমব্যাট ফ্লাইট সিমুলেটরগুলো অত্যন্ত জটিল বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাব, ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়ার রেখা এবং এয়ারফ্রেমের ক্ষয়ক্ষতির নিখুঁত চিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারে, যা নিম্নমানের রেজোলিউশনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডে সাধারণ দর্শকদের বিভ্রান্ত করতে পারে। এই ক্ষেত্রে, অপপ্রচারকারীরা ভিডিওটির আসল অডিও সরিয়ে ফেলে, ইউজার ইন্টারফেসের চিহ্নগুলো ক্রপ করে এবং ডিজিটাল কম্প্রেশন প্রয়োগ করে ভিডিও গেমের গ্রাফিক্সের স্পষ্টতা নষ্ট করে দেয়, যাতে কম্পিউটার-জেনারেটেড রেন্ডারিংকে আসল থার্মাল বা নাইট-ভিশন বিমানবিধ্বংসী ফুটেজ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়।
বানোয়াট চিত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অসঙ্গতি
ভিডিও ক্লিপের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট থেকে কিছু স্থিরচিত্রও প্রচার করা হয়, যেখানে উৎসুক জনতার ভিড়ের মধ্যে ইরানের মাটিতে ইসরায়েলি এফ-৩৫-এর পুড়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়। স্নোপস এবং এএফপি ফ্যাক্ট চেক-সহ তথ্য-যাচাইকারী সংস্থাগুলো এই ছবিগুলো ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার আওতায় আনে এবং নিশ্চিত করে যে এগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুলের সাহায্যে তৈরি সিন্থেটিক চিত্র।
বিশ্লেষিত চিত্রগুলোতে বেশ কিছু কাঠামোগত অসঙ্গতি দেখা গেছে যা সেগুলোর অসারতা প্রমাণ করে:
- বিকৃত অনুপাত: ছবিতে প্রদর্শিত বিমানের ধ্বংসাবশেষটি অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বিশাল ছিল—লকহিড মার্টিন এফ-৩৫ লাইটনিং ২-এর বাস্তব কাঠামোর (দৈর্ঘ্য ৫১ ফুট এবং ডানার বিস্তার ৩৫ ফুট) তুলনায় প্রায় তিন গুণ বড়।
- গাঠনিক অসঙ্গতি: ককপিটের ক্যানোপি, জোড়া উল্লম্ব স্ট্যাবিলাইজার এবং এয়ার ইনটেকের গঠন ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর ব্যবহৃত এফ-৩৫আই ভ্যারিয়েন্টের স্ট্যান্ডার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন ও প্যানেল বিন্যাসের সঙ্গে মিল ছিল না।
- এআই-এর অসঙ্গতি: আশেপাশের ভিড়ে থাকা মানুষের মুখের অবয়ব বিকৃত, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান অস্বাভাবিক এবং টেক্সচার ঝাপসা দেখা গেছে, যা জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবির সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
অভিযানের বাস্তবতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রত্যাহার
সামরিক নথি এবং যাচাইকৃত তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ইরানের সামরিক ও আকাশ প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে দূরপাল্লার হামলা পরিচালনার সময় ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর কোনো বিমানের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর আন্তর্জাতিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি এই দাবিগুলোকে ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডা বলে উড়িয়ে দেন, যা মূলত অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক জনসমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে একটি কাল্পনিক বিজয়ের আখ্যান তৈরির চেষ্টা ছিল। তিনি নিশ্চিত করেন যে সমস্ত মোতায়েনকৃত বিমান তাদের অভিযান সম্পন্ন করে নিরাপদে নিজ নিজ ঘাঁটিতে ফিরে এসেছে।
কোনো প্রকার যাচাইযোগ্য ধ্বংসাবশেষ বা টেলিমেট্রি তথ্য না থাকায় ইরানি কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত নিঃশব্দে এই দাবি থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি)-এর প্রধান পেইমান জেবেলি পরবর্তীকালে তেহরানের শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তব্যে স্বীকার করেন যে, ইসরায়েলি বিমান ধ্বংসের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে যেসব তথ্য প্রচার করা হয়েছিল তা যাচাই না করেই করা হয়েছিল এবং সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।