ছবি পুনর্বহালের ভিত্তিহীন অভিযোগের সূত্রপাত
২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষ এবং নভেম্বরের শুরুর দিকে বিভিন্ন প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টে দাবি করা হয় যে, গাজা উপত্যকার ক্ষয়ক্ষতি গোপন করতে অ্যাপল ম্যাপস গোপনে কারসাজি করেছে। নেটিজেনরা খান ইউনিস ও রাফাহর মতো গাজার শহরাঞ্চলগুলোর গুগল ম্যাপস ও অ্যাপল ম্যাপসের পাশাপাশি স্ক্রিনশট শেয়ার করতে থাকেন। গুগল ম্যাপসে সংঘাত-পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞ দেখা গেলেও অ্যাপল ম্যাপসে অক্ষত নগর অবকাঠামো দেখা যাচ্ছিল। এর ওপর ভিত্তি করে দাবি করা হয় যে, অ্যাপল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যুদ্ধপূর্ব স্যাটেলাইট ছবি "পুনর্বহাল" করেছে, যাতে ধ্বংস হওয়া ভবনগুলো ডিজিটালি পুনর্নির্মাণ করে ইসরায়েল-পন্থী প্রচার চালানো যায়। তবে এই দাবিগুলো বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট মানচিত্রাঙ্কনের প্রযুক্তিগত বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত।
বাণিজ্যিক ছবি সংগ্রহ ও হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া
অ্যাপল ম্যাপস এবং গুগল ম্যাপসের মতো ভোক্তা-কেন্দ্রিক মানচিত্র সেবা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্মগুলো নিজস্ব গোয়েন্দা স্যাটেলাইট পরিচালনা করে না কিংবা সার্বক্ষণিক লাইভ কক্ষপথীয় নজরদারিও চালায় না। এর পরিবর্তে, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলো ম্যাক্সার টেকনোলজিস, প্ল্যানেট ল্যাবস এবং এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেসের মতো বাণিজ্যিক রিমোট-সেন্সিং সরবরাহকারীদের কাছ থেকে অপটিক্যাল স্যাটেলাইট ডেটার লাইসেন্স নেয়। কক্ষপথ থেকে পাওয়া কাঁচা ডেটাকে ব্যবহারযোগ্য মানচিত্রে রূপান্তর করা একটি জটিল প্রকৌশল প্রক্রিয়া, যার মধ্যে অর্থোরেктиফিকেশন, মেঘ অপসারণ, বায়ুমণ্ডলীয় ধোঁয়াশা দূরীকরণ, রেডিওমেট্রিক রঙের ভারসাম্য এবং সিমলাইন সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যেহেতু মেঘমুক্ত আঞ্চলিক বেস মোজাইক তৈরির জন্য ব্যাপক ডেটা প্রক্রিয়াকরণ এবং লাইসেন্স চুক্তির প্রয়োজন হয়, তাই কনজিউমার ম্যাপিং অ্যাপ্লিকেশনগুলো বিভিন্ন সময়ে তাদের স্যাটেলাইট ছবি পর্যায়ক্রমে হালনাগাদ করে, যা প্রায়শই কয়েক বছর পর্যন্ত সময় নেয়। কোনো ম্যাপিং প্ল্যাটফর্মে পুরনো ছবি প্রদর্শিত হওয়ার অর্থ হলো তাদের আপডেট চক্র এখনও সম্পন্ন হয়নি; এর মানে কোনো সক্রিয় ডিজিটাল কারসাজি বা পূর্বে প্রকাশিত দৃশ্য প্রত্যাহার করে নেওয়া নয়।
গুগল ও অ্যাপলের মধ্যে হালনাগাদের সময়ের ব্যবধান
যে দৃশ্যমান বৈসাদৃশ্যের কারণে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম হয়েছিল, তা মূলত গুগলের একটি নির্ধারিত আপডেটের ফল, অ্যাপলের কোনো পরিবর্তনের কারণে নয়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে, এল পাইস (EL PAÍS)-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, গুগল ম্যাপস গাজা উপত্যকার বেশিরভাগ অংশের স্যাটেলাইট স্তর হালনাগাদ করেছে এবং ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ধারণ করা উচ্চ-রেজোলিউশনের বাণিজ্যিক ছবি যুক্ত করেছে। এই আপডেটের মাধ্যমে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সন্ত্রাসী হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাতের দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রকাশ পায়।
এল পাইস এই রোলআউটের সময় উল্লেখ করেছিল যে, গুগল এমন একটি আপডেট এনেছে যা অ্যাপল ম্যাপসসহ অন্যান্য প্রধান ম্যাপিং সেবাগুলো তখনও সম্পন্ন করেনি। অ্যাপল ম্যাপস কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আপডেট ছাড়াই তাদের সংঘাত-পূর্ববর্তী স্ট্যান্ডার্ড বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট মোজাইক বজায় রেখেছিল। কয়ার নিউজ (Choir News)-এর স্বতন্ত্র অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে যে, অ্যাপল ২০২৩-পরবর্তী কোনো স্যাটেলাইট স্তর যুক্ত করে পরে তা সরিয়ে নেয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা দুটি প্রতিযোগী বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মের স্বাভাবিক প্রযুক্তিগত সময়ের ব্যবধানকে ভুলবশত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও গোপন কারসাজি বলে ধরে নিয়েছেন।
নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড ও বাণিজ্যিক স্বচ্ছতা
ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলের জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্যাটেলাইট চিত্র কোনো করপোরেট ইচ্ছার পরিবর্তে মার্কিন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে আসছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে, ১৯৯৭ সালের ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্টের কাইল-বিঙ্গামান সংশোধনীর আওতায় মার্কিন বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট অপারেটরদের ওপর ইসরায়েল ও Arab Settler অঞ্চলের দুই মিটারের চেয়ে সূক্ষ্ম রেজোলিউশনের ছবি বিক্রির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ছিল। তবে অফিস অব স্পেস কমার্স এবং ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বিশদ পর্যালোচনার পর ২০২০ সালের জুলাই মাসে ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত এক নির্দেশনায় মার্কিন কর্তৃপক্ষ এই সীমা শিথিল করে ০.৪ মিটারে নামিয়ে আনে, কারণ বিদেশি প্রতিপক্ষরা আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিমধ্যেই সাব-মিটার রেজোলিউশনের ছবি বিক্রি করছিল।
এনপিআর (NPR)-এর বিশদ প্রতিবেদনে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের যেকোনো গবেষক, সাংবাদিক এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য এই অঞ্চলের উচ্চ-রেজোলিউশনের স্যাটেলাইট ছবি সহজেই সংগ্রহযোগ্য। প্রতিটি বাণিজ্যিক সফটওয়্যার পণ্য কখন এই ডেটাসেটগুলো গ্রহণ ও প্রকাশ করবে, তা তাদের রুটিন ইঞ্জিনিয়ারিং অগ্রাধিকার এবং সরবরাহকারী চুক্তির ওপর নির্ভর করে। ফলে আদর্শিক সেন্সরশিপ বা ডিজিটাল পুনর্নির্মাণের মতো অভিযোগগুলো পুরোপুরি ভিত্তিহীন।