বৈরুত বিমানবন্দর নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ছবির বিস্তারিত বিশ্লেষণ
২০২৪ সালের অক্টোবরে বিশ্বজুড়ে সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোতে বেশ কিছু নাটকীয় দৃশ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় বৈরুত-রফিক হারিরি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চারদিকে আগুন ও ধ্বংসযজ্ঞের এক প্রলয়ংকরী পরিস্থিতির মধ্যে বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান অবতরণ করছে। ভাইরাল পোস্টগুলোতে দাবি করা হয় যে, ইসরায়েলি বিমান হামলায় রানওয়েতে ছড়িয়ে পড়া বিধ্বংসী আগুনের মাঝেই মিডল ইস্ট এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট অবতরণ করছিল। তবে নিরপেক্ষ ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা এবং এভিয়েশন সংক্রান্ত নথি নিশ্চিত করেছে যে, এই চমকপ্রদ ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বানোয়াটভাবে তৈরি করা হয়েছে।
সিন্থেটিক অসংগতির ফরেনসিক শনাক্তকরণ
অঁজঁস ফ্রঁস-প্রেস (এএফপি), ডয়চে ভেলে এবং ফুল ফ্যাক্ট-এর মতো সংস্থাগুলোর পরিচালিত ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে ব্যাপক ডিজিটাল অসংগতি ধরা পড়েছে, যা প্রমাণ করে যে ছবিগুলো বাস্তব ফটোসাংবাদিকতার নিদর্শন নয়, বরং কৃত্রিমভাবে তৈরি:
- বিমানের কাঠামোগত অসংগতি: ভাইরাল ছবিগুলোর বিমানে জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুস্পষ্ট ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। বিমানগুলোর অগ্রভাগ (নোজ কোণ) অদ্ভুতভাবে খণ্ডিত ও অস্বাভাবিক, যাত্রীদের জানালার সারিগুলো অসমান, ককপিটের ফ্রেম অস্পষ্ট বা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত এবং মিডল ইস্ট এয়ারলাইন্সের বহরের কোনো বাণিজ্যিক বিমানের সঙ্গে মেলে না এমন ভুল লোগো ও নকশা দেখা যায়।
- স্থাপত্য ও আলোকসম্পাতের ত্রুটি (হ্যালুসিনেশন): ছবিগুলোতে থাকা টার্মিনাল ভবন, কন্ট্রোল টাওয়ার ও সীমানা প্রাচীরগুলোর স্থাপত্য কাঠামো বিকৃত এবং অবাস্তব। জটিল স্থাপনা রেন্ডার করার সময় ইমেজ সিন্থেসিস মডেলগুলো সাধারণত যে ধরনের আঁকাবাঁকা জানালার রেখা ও অর্থহীন বিম তৈরি করে, এখানেও ঠিক তাই দেখা গেছে।
- অবাস্তব আগুনের গতিপ্রকৃতি: ছবিতে দেখানো আগুন এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলীর সঙ্গে বাস্তব বিস্ফোরণ কিংবা জেট জ্বালানির অগ্নিকাণ্ডের কোনো প্রাকৃতিক মিল নেই। টারম্যাকের চারপাশে অবাস্তব ও কৃত্রিম শিখার টেক্সচার থাকলেও রানওয়ের উপরিভাগে কোনো পোড়া দাগ, উত্তাপের কারণে সৃষ্ট অপটিক্যাল বিকৃতি (হিট হেজ) কিংবা সংশ্লিষ্ট ছায়ার কোনো বাস্তব প্রতিফলন নেই।
লেবাননের জাতীয় ক্যারিয়ার মিডল ইস্ট এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তারা তথ্য যাচাইকারীদের কাছে সরাসরি নিশ্চিত করেছেন যে ছবিগুলো সম্পূর্ণ কৃত্রিম ও ভুয়া এবং বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই; পাশাপাশি বাণিজ্যিক বিমান পরিচালনায় রানওয়েতে অগ্নিকাণ্ডের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।
অভিযানের প্রেক্ষাপট ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু
২০২৪ সালের অক্টোবরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সময় ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস বৈরুতের দক্ষিণে অবস্থিত দাহিয়েহ শহরতলিতে কেন্দ্রীভূত সন্ত্রাসী সংগঠনটির ভূগর্ভস্থ কমান্ড বাঙ্কার, অস্ত্রাগার এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। ইসরায়েল বারবার জোর দিয়ে জানায় যে তাদের অভিযান বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর নয়, বরং কঠোরভাবে হিজবুল্লাহর সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর পরিচালিত হচ্ছে এবং নির্ধারিত হিজবুল্লাহ স্থাপনার কাছাকাছি বসবাসকারী লেবানিজ বেসামরিক নাগরিকদের আগেই নিরাপদে সরে যাওয়ার সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছিল।
বৈরুত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু থাকা অবস্থায় অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এর মতো সংবাদমাধ্যমের প্রকৃত আলোকচিত্রে দেখা গেছে যে, বিমানগুলো স্বাভাবিকভাবেই ওঠানামা করছে এবং কয়েক কিলোমিটার দূরে দাহিয়েহ অঞ্চলে হওয়া হামলার ধোঁয়া দূর দিগন্তে উঠছে। পেশাদার আলোকচিত্রীদের ব্যবহৃত টেলিফটো লেন্স বিমানবন্দর এবং প্রতিবেশী জেলাগুলোর লক্ষ্যবস্তুর মধ্যকার দূরত্বকে চাক্ষুষভাবে সংকুচিত করায় এগুলোকে খুব কাছে বলে মনে হয়েছিল। অনলাইন বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীরা এই বাস্তব প্রেক্ষাপটকে অপব্যবহার করে চাঞ্চল্যকর ও কম্পিউটারে তৈরি ভুয়া ছবি ছড়িয়ে দেয়, যেখানে মিথ্যা দাবি করা হয় যে রানওয়েতেই আগুন জ্বলছে।
সংঘাত চলাকালে কোনো সময়েই রফিক হারিরি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ইসরায়েলি অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত, বোমাবর্ষিত বা অগ্নিদগ্ধ হয়নি। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলো বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের বদলে চাঞ্চল্যকর মিথ্যার মাধ্যমে ক্ষোভ উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি সুপরিকল্পিত ডিজিটাল জালিয়াতি মাত্র।