'ফলস ফ্ল্যাগ' দাবির নেপথ্যের উৎস
২০২৬ সালের অক্টোবরে, দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বে চালানো গণহত্যার তৃতীয় বার্ষিকীতে, মিডিয়া ভাষ্যকার টাকার কার্লসন একটি অনুষ্ঠান প্রকাশ করে দাবি করেন যে প্রয়াত রক্ষণশীল সংগঠক চার্লি কার্ক "শুরু থেকেই সন্দেহ করেছিলেন যে ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের একটি ফলস ফ্ল্যাগ অভিযান ছিল।" কার্লসন দাবি করেন কার্ক বিশ্বাস করতেন যে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সহ ইসরায়েলি নেতারা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি সংঘাতে জড়াতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই আগ্রাসনের পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন। এই দাবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি ইসরায়েলবিরোধী ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে এগিয়ে নিতে কার্কের প্রকৃত প্রকাশ্য বক্তব্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে কার্ক প্রকৃতপক্ষে কী বলেছিলেন
কার্লসনের এই আখ্যানটি ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর প্রচারিত দ্য চার্লি কার্ক শো-এর একটি অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা ছিল হাজার হাজার হামাস সন্ত্রাসী গাজার সীমান্ত প্রাচীর ভেঙে ফেলার মাত্র পাঁচ দিন পরের ঘটনা। সেই পর্বে কার্ক বিপর্যয়মূলক গোয়েন্দা ব্যর্থতা এবং আক্রান্ত সম্প্রদায়গুলোর ওপর ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেসের পুনরায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে দীর্ঘবিলম্ব দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে প্রশ্ন করেছিলেন: "সেখানে কি কোনো পাল্টা পদক্ষেপ না নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল?"
তবে, সামরিক সমন্বয়হীনতা ও স্থবিরতা নিয়ে কার্কের এই অনুমানমূলক অনুসন্ধান রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চালানো কোনো ষড়যন্ত্রের দাবির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। সমসাময়িক প্রতিবেদন এবং ইনেটনিউজ (Ynetnews)-এর বিস্তারিত তথ্যানুযায়ী, কার্ক স্পষ্টতই ইসরায়েল সরকারকে আক্রমণ সাজানো বা তা ঘটতে দেওয়ার অভিযোগ করা থেকে বিরত ছিলেন। কার্লসন যে সম্প্রচারের উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন, ঠিক সেখানেই কার্ক স্বীকার করেছিলেন যে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কাছে আগাম সতর্কতা ছিল কি না তা তিনি জানতেন না; তিনি কেবল সীমান্ত প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলছিলেন এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে নিশ্চিত করেছিলেন যে নৃশংসতাগুলো হামাসই ঘটিয়েছে। কার্ক কোনো পর্যায়েই দাবি করেননি যে হামলাগুলো বিশ্বকে প্রতারিত করতে বা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি "ফলস ফ্ল্যাগ" অভিযান ছিল।
ইসরায়েলের পক্ষে কার্কের ধারাবাহিক সমর্থন
টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাঁর পুরো কর্মজীবনে এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগ পর্যন্ত, কার্ক ছিলেন ইসরায়েল ও এর নিরাপত্তার একজন অকপট রক্ষক। বিদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনির্দিষ্টকালের সামরিক মোতায়েনের ব্যাপারে কার্ক তাঁর "আমেরিকা ফার্স্ট" সংশয়বাদকে সমর্থন করলেও, গণতান্ত্রিক ইসরায়েল এবং ইসলামি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর মধ্যকার স্পষ্ট নৈতিক পার্থক্যকে তিনি সর্বদা বজায় রেখেছিলেন:
- হামাসের নিন্দা: হামলার পরপরই এবং পরবর্তী সময়ে দেওয়া বিভিন্ন মন্তব্যে, কার্ক ১,২০০ জনেরও বেশি ইসরায়েলিকে হত্যা, শত শত মানুষকে জিম্মি করা এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বর্বর নৃশংসতা চালানোর জন্য হামাসের বারবার তীব্র নিন্দা জানান।
- আত্মরক্ষার অধিকার: হামাসের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে এবং সহিংস অনুপ্রবেশ থেকে নিজের সীমান্ত রক্ষা করতে ইসরায়েলের সার্বভৌম অধিকারকে কার্ক ধারাবাহিকভাবে সমর্থন জানিয়েছেন।
- ইহুদিবিদ্বেষের বিরোধিতা: আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে উগ্র জায়নবাদবিরোধিতার মোকাবিলা করতে, হামাসপন্থী প্রোপাগান্ডা উন্মোচিত করতে এবং হয়রানির শিকার ইহুদি শিক্ষার্থীদের রক্ষায় কার্ক নিয়মিত রক্ষণশীল শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করেছিলেন।
ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ যেমনটি উল্লেখ করেছে, রাজনৈতিক অঙ্গনের সব মহলেই কার্ক ইসরায়েলের একজন কট্টর মিত্র হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। কার্কের হত্যাকাণ্ডের পর, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁদের ব্যক্তিগত সংলাপ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের কথা স্মরণ করে প্রকাশ্যে তাঁকে "ইসরায়েলের একজন সাহসী বন্ধু" হিসেবে অভিহিত করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
'ফলস ফ্ল্যাগ' অপতথ্যের স্বরূপ
৭ অক্টোবরের নৃশংসতা ইসরায়েল নিজেই পরিচালনা করেছিল বা স্বাগত জানিয়েছিল—এমন ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো একটি ব্যাপক ও তথ্যপ্রমাণিত বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার অংশ, যা ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ-এর মতো সংস্থাগুলো বিশ্লেষণ করেছে। এই ধরনের প্রচারণার উদ্দেশ্য হলো হামাস সন্ত্রাসী এবং তাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক ইরানি শাসকদের ওপর থেকে দায় সরিয়ে নেওয়া এবং ইহুদিদের কূটকৌশল ও প্রতারণা সংক্রান্ত প্রাচীন ইহুদিবিদ্বেষী ধারণাকে নতুন করে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। সামরিক প্রস্তুতির ব্যর্থতা দেখে কার্কের প্রাথমিক ধাক্কা লাগার অভিব্যক্তিকে বিকৃত করে একটি সাজানো "ফলস ফ্ল্যাগ" অপবাদের স্বীকৃতি হিসেবে উপস্থাপন করা তাঁর নথিবদ্ধ বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।