মার্সেইয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার অভিযোগের উৎস
২০২৬ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও স্থানীয় নানা ক্ষোভের জেরে ফ্রান্সজুড়ে তীব্র গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যাতে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। বিক্ষোভের বড় অংশ শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু উগ্রপন্থী ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠী প্যারিস, লিওঁ, লিমোজেস এবং মার্সেইয়ে পুলিশের সাথে সহিংস সংঘর্ষে জড়ায়, সরকারি প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালায় এবং বাণিজ্যিক দোকানপাটের ক্ষতিসাধন করে। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই সম্প্রচার মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি যাচাইহীন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে মার্সেইয়ের দাঙ্গাকারীরা ইহুদিদের মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পূর্বপ্রস্তুত তালিকা সংগ্রহ করেছে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংলগ্ন মুসলিমদের দোকানগুলো ছেড়ে কেবল ইহুদিদের দোকানগুলোতেই পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।
মার্সেইয়ের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে সম্পত্তি ধ্বংসের পেছনে পরিকল্পিত সমন্বয় রয়েছে—সম্প্রচার মাধ্যমে এমন অভিমত প্রকাশের পর এই দাবিটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে বিষয়টিকে আরও বাড়িয়ে উপস্থাপন করা হয় এবং শহরের এই সম্পত্তি ধ্বংসকে সামগ্রিক নাগরিক অস্থিরতা ও সুবিধাবাদী অপরাধের অংশ হিসেবে না দেখে, শহরের ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত পোগ্রোম বা নিধনযজ্ঞ হিসেবে চিত্রিত করা হয়।
নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্ত ফলাফল
দাঙ্গাকারীরা তালিকা ধরে বা কোনো সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য নিয়ে হামলা চালিয়েছে—এমন দাবি ফরাসি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আনুষ্ঠানিক তদন্ত এবং নাগরিক নেতৃবৃন্দের সরেজমিন পর্যালোচনায় দ্রুতই নাকচ হয়ে যায়। বুশ-দ্যু-রোন পুলিশ প্রিফেকচার ও মার্সেই পৌর কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন নিশ্চিত করেছে যে, নগরকেন্দ্রে ঘটা ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক, তাৎক্ষণিক সুযোগসন্ধানী ও নির্বিচার। রু প্যারাডিস ও এর আশপাশের বাণিজ্যিক জেলাগুলোর প্রধান শপিং এলাকাগুলোতে দোকানমালিকদের জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং মূলত মূল্যবান সামগ্রীর সহজলভ্যতার ভিত্তিতে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয়।
সহিংসতা সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, মার্সেইজুড়ে লুটেরারা বিলাসবহুল বুটিক, গহনার দোকান, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এবং বেকারিতে হানা দেয়। কোনো আদর্শিক উদ্দেশ্যে বেছে বেছে ইহুদি ব্যবসায়ীদের নিশানা করার বদলে দাঙ্গাকারীরা বাণিজ্যিক লোভের বশবর্তী হয়ে এরমেস বুটিকসহ বিভিন্ন সাধারণ খুচরা দোকানপাটে ব্যাপক হামলা চালায়। একই সময়ে সহিংস বিক্ষোভকারীরা নাগরিক প্রতীকগুলোর ওপর ক্ষোভ উগরে দেয়; তারা একটি স্থানীয় থানায় হামলা চালায় এবং মার্সেই সিটি হলে সাময়িকভাবে ঢুকে পড়ে পৌর সম্পত্তির ক্ষতি করে ও দেওয়ালে নৈরাজ্যবাদী প্রতীক এঁকে দেয়।
ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব ও আনুষ্ঠানিক খণ্ডন
ফ্রান্সের ইহুদি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই ভ্রান্ত বয়ান সরাসরি খণ্ডন করেছে। ফরাসি ইহুদি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী পরিষদের (সিআরআইএফ) মার্সেই-প্রোভঁস শাখার সভাপতি ব্রুনো বেঞ্জামিন জানিয়েছেন যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই হামলা চালানো হয়েছে এবং কোনো সংগঠিত তালিকা বা ইহুদিবিদ্বেষী সুনির্দিষ্ট অগ্নিসংযোগের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সার্ভিস দ্য প্রোটেকশন দ্য লা কম্যুনিটি জুইভ (এসপিসিজে)-সহ ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত করেছে যে, মার্সেইয়ের কেন্দ্রস্থলে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক লুটপাটের শিকার বেশ কিছু ইহুদি মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হলেও দাঙ্গাকারীরা তালিকা হাতে নিয়ে বেছে বেছে তাদের নিশানা করেনি।
সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ এবং পৌর পর্যবেক্ষকরা জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে ব্যাপক নাগরিক বিশৃঙ্খলা ও সুযোগসন্ধানী চুরির ঘটনাকে ইহুদিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিকল্পিত হামলা হিসেবে গুলিয়ে ফেললে তা রাস্তার সহিংসতার প্রকৃত রূপ এবং বাস্তবিক ইহুদিবিদ্বেষের গুরুতর চরিত্র উভয়ের ওপরই বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। ফরাসি কর্তৃপক্ষ ইহুদিবিদ্বেষী হুমকির বিষয়ে সর্বদা সজাগ থাকলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নথি ও নাগরিক পর্যবেক্ষণে এটি প্রমাণিত হয়েছে যে মার্সেইয়ের সম্পত্তি ধ্বংসযজ্ঞ কোনো সুসংগঠিত সাম্প্রদায়িক আক্রমণ ছিল না, বরং তা ছিল একটি বেপরোয়া নগর বিশৃঙ্খলা, যা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।