বানোয়াট স্ক্রিনশটের নেপথ্য কৌশল
হাসপাতালের নিচে হামাসের সুড়ঙ্গ নিয়ে ইসরায়েলের "সাজানো নাটক" ফাঁস করে দেওয়ার অপরাধে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিককে বরখাস্ত করেছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা পুরোপুরি একটি ডিজিটাল জালিয়াতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বাসযোগ্যতা আদায়ের লক্ষ্যে অনলাইন অপপ্রচারগুলোতে প্রায়শই ব্রাউজারের দৃশ্যপট পরিবর্তন, ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমের টেমপ্লেট নকল করে এ ধরনের জাল উপাদান তৈরি করা হয়। কোনো প্রতিবেদককে এ ধরনের কারণে বরখাস্ত করার কোনো নথিপত্র, সংশোধনী বা কর্মীসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর পক্ষ থেকে কখনো প্রকাশ করা হয়নি। গাজা উপত্যকায় মাটির নিচের অবকাঠামো নিয়ে পত্রিকাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ দৃশ্যমান ও সরেজমিন অনুসন্ধানের নেতৃত্বে থাকা সাংবাদিকরা—যাদের মধ্যে রয়েছেন ম্যাথু রোজেনবার্গ, রনেন বার্গম্যান এবং এরিক টোলার—এখনও তাদের নিয়মিত সাংবাদিকতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভূগর্ভস্থ সামরিক কাঠামোর সরেজমিন সত্যতা
হাসপাতালের নিচে সামরিক সুড়ঙ্গের ফুটেজ ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বানোয়াটভাবে তৈরি করেছে—এমন দাবির বিপরীতে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সরাসরি নথিভুক্ত করা বিপুল ও যাচাইযোগ্য বস্তুগত প্রমাণ বিদ্যমান। ২০২৩ সালের নভেম্বরে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং রয়টার্স-সহ আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর স্বাধীন সাংবাদিকদের গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতাল চত্বরে উন্মোচিত ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনাগুলো সরাসরি পরিদর্শন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
সাংবাদিকরা হাসপাতালের প্রাঙ্গণের প্রায় ১০ মিটার নিচে অবস্থিত একটি সুরক্ষিত, ৫৫ মিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গের ভেতর সরাসরি হেঁটে পর্যবেক্ষণ করেন। সেখানে ধারণ করা দৃশ্যমান প্রমাণগুলোতে এই উপকূলীয় ছিটমহলে হামাসের নেটওয়ার্কগুলোর সুপরিচিত সামরিক প্রকৌশলের ছাপ স্পষ্ট দেখা গেছে—যার মধ্যে রয়েছে ধনুকাকৃতির কংক্রিটের ছাদ, বিস্ফোরণ-প্রতিরোধী সুরক্ষা দরজা, বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ, বায়ু চলাচলের পথ এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ছোট রান্নাঘর ও শৌচাগারের মতো ব্যবহারিক সুবিধাসমূহ। বিদেশি সাংবাদিকরা সরেজমিনে নিশ্চিত করেছেন যে এই ভূগর্ভস্থ পথটি শুরু হয়েছিল হাসপাতাল চত্বরের ভেতরে থাকা একটি খাড়া সুড়ঙ্গমুখ (ভার্টিক্যাল শ্যাফট) থেকে।
নিরপেক্ষ গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা তথ্যের সমর্থন
পরবর্তীতে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর বিশদ অনুসন্ধানগুলো চিকিৎসাকেন্দ্রের নিচে হামাসের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টি খণ্ডন না করে বরং তা আরও সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি ইন্টারঅ্যাক্টিভ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ভূগর্ভস্থ ব্লুপ্রিন্ট, স্থাপত্যের নকশা এবং ড্রোনের ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে হামাসের যোদ্ধারা সক্রিয়ভাবে আল-শিফা কমপ্লেক্সের নিচের সুড়ঙ্গ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার করত। এই অনুসন্ধানে দেখা যায়, হাসপাতালের মূল বিদ্যুৎ সংযোগ সরাসরি মাটির নিচের সুরক্ষিত নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত ছিল।
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর স্বাধীন মূল্যায়নও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অবমুক্ত করা মার্কিন সরকারি মূল্যায়নে নিশ্চিত করা হয় যে হামাস এবং তাদের মিত্র Iranian Proxy Forces আল-শিফাকে কমান্ড সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করত, কমপ্লেক্সের ভেতরে অস্ত্র মজুদ রাখত এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় আটক বেসামরিক জিম্মিদের এর ভূগর্ভস্থ কক্ষে আটকে রেখেছিল—এ ব্যাপারে মার্কিন গোয়েন্দারা অত্যন্ত আস্থাশীল।
গাজা তথ্যযুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল
বেসামরিক অবকাঠামোকে সামরিক কাজে ব্যবহারের সত্যতা ধামাচাপা দিতে পরিকল্পিতভাবে যে ন্যারেটিভ সাজানো হয়, এই বানোয়াট স্ক্রিনশট ছড়ানো সেই কৌশলেরই অংশ। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ সাংবাদিকতার কেলেঙ্কারির ভুয়া গল্প ফেঁদে এই অপপ্রচারকারীরা সুস্পষ্ট বস্তুগত প্রমাণকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং হামাসের মানবঢাল ব্যবহারের প্রমাণিত কৌশল থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে চায়। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসারে চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো সুরক্ষিত মর্যাদা পেলেও, যখন সেগুলোকে সামরিক ঘাঁটির সাথে কাঠামোগতভাবে যুক্ত করা হয়, তখন সেই সুরক্ষা লঙ্ঘিত হয়।
সাংবাদিকতার কোনো গোপন সত্য ফাঁস করার বদলে এই ভাইরাল স্ক্রিনশটটি উল্টো স্পষ্ট করে দেয় যে কীভাবে অসদুপায়ে সত্য তথ্যকে নস্যাৎ করতে জাল প্রমাণ তৈরি করা হয়। সাংবাদিকদের সরাসরি সরেজমিন পরিদর্শন এবং অবমুক্ত গোয়েন্দা তথ্য উভয়েই নিশ্চিত করে যে গাজার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর নিচে সুড়ঙ্গগুলো ছিল হামাসের তৈরি বাস্তব সামরিক স্থাপনা, কোনো ইসরায়েলি সাজানো নাটক নয়।